সাগরবাণীবেসরকারি হাসপাতালে মনগড়া বিলের ছড়াছড়ি! মহান পেশা বন্ধী সিন্ডিকেটের বেড়াজালে। - সাগরবাণী বেসরকারি হাসপাতালে মনগড়া বিলের ছড়াছড়ি! মহান পেশা বন্ধী সিন্ডিকেটের বেড়াজালে। - সাগরবাণী

বেসরকারি হাসপাতালে মনগড়া বিলের ছড়াছড়ি! মহান পেশা বন্ধী সিন্ডিকেটের বেড়াজালে।

প্রকাশ: ২০২০-০৭-১৮ ১৬:২৪:২৩ || আপডেট: ২০২০-০৭-১৮ ১৬:২৪:২৩

অ্যাড. রিগ্যান কান্তি দাশ▪

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, “স্বাস্থ্য হল শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে মানুষের ভালো থাকা, শুধুমাত্র দুর্বলতা বা রোগব্যাধিহীনতাই নয়।” তাহলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করতে গিয়ে রোগীর আত্মীয় স্বজনেরাও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে হাসপাতালের ভিত্তিহীন বিল আর হয়রানির কারণে। সম্প্রতি করোনাভাইরাস যতটা না মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, এর চেয়ে বেশি করোনা আতঙ্কে তার মনুষ্যত্বকে হারিয়েছে। দৈহিক মৃত্যুর চেয়েও মনুষ্যত্বের এই মৃত্যু নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেদনাদায়ক। আট হাসপাতালে ঘুরেও কিডনি জটিলতায় অসুস্থ অতিরিক্ত সচিব বাবা, গৌতম আইচ সরকারকে বাঁচাতে পারলেন না ডাক্তার মেয়ে সুস্মিতা।
তিনি জানান, আমাদের আশপাশে এমন কোন হাসাপাতাল নেই যেখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করিনি। আমি ডাক্তার পরিচয় দিয়ে বাবা যে করোনা সাসপেক্টেট নয় সেটা বলার পরও কোথাও ভর্তি নেয়নি। যার কারণে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে হলো তার বাবাকে। দেশে ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল আছে আর শুধু হাসপাতাল-ক্লিনিক আছে প্রায় ১০ হাজারের মতো। ডায়াগনস্টিক সেন্টার তো ব্যাঙের ছাতার মতো। স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭০ শতাংশজুড়ে অবস্থান করা বেসরকারি চিকিৎসা
ব্যবস্থাপনা। অথচ এ সংকটকালে ওইসব হাসপাতাল, ক্লিনিকও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেও মানুষ চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে। এত কাঠকয়লা পুড়িয়ে যদি কেউ হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পায় তাহলে রোগী ভালো হোক বা না হোক অথবা মারা যাক কিন্তু তবুও ছাড়েনা বিলের বিড়ম্বনা।

গত ২৮-০৬-২০২০ তারিখে সময় সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, ওষুধ-স্যালাইনেই হাসপাতালের বিল ৯৪ হাজার টাকা! হারুন উর রশিদ সানী বাবা আনিস মিয়াকে হারিয়ে শোকে দিশেহারা। কয়েক দিনের জ্বরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এদিকে শোকাহত সন্তানের হাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিলের ফর্দে তারা দিশেহারা। অন্যদিকে গত ১৮ জুলাই, বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীর স্বাধীনকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর ২২ ঘণ্টারও কম সময়ে বিল এসেছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৪ টাকা। এত কম সময়ে কী করে এত টাকা বিল হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ফিরোজের পরিবারসহ তার সহপাঠীরা। বিল নিয়ে কথা বলতে গেলে কয়েক জায়গায় ঘুরিয়েও কোনও তথ্য দিতে পারেনি স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই রকম অহরহ অমানবিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে আমাদের চিকিৎসা সেবা।

হেলথ ওয়াচের সমীক্ষার হিসাবে, বাংলাদেশে ২০১০ সালে মোট ছয় হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের একজন শিক্ষক ও গবেষক বলেন, এর অর্ধেকটাই, তিন হাজার কোটি টাকার ওষুধ অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয়; ‘ইর্র‌্যাশনাল ইউজ অব ড্রাগ’ বা ওষুধের অযৌক্তিক ব্যবহার। ওষুধ কোম্পানিগুলোর বেপরোয়া বিপণন তৎপরতার ফলে ১৯৯৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। ওষুধ বেশি বিক্রি হলে কোম্পানির লাভ, চিকিৎসকেরও লাভ। তাই ওষুধ বিক্রি না বাড়ার কোনোই কারণ নেই। রোগী চিকিৎসকের কাছে গেলেই তাঁকে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই মহান পেশায় মুনাফার যে সংস্কৃতি তৈরী হচ্ছে তাতে করে চিকিৎসা পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে চিকিৎসকের অবহেলায় এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায়, ব্যার ঐ হাসপাতালকে জরিমানা করলে সেই ঘটনা-পরম্পরায় বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এক রিট শুনানিতে মাননীয় বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এর গঠিত সম্বন্ধিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, “কতিপয় দুর্বৃত্তের কর্মকাণ্ডের কারণে চিকিৎসাসেবার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বিপদে পড়লে মানুষ তিন জনের কাছে যায়। পুলিশ, আইনজীবী ও ডাক্তার। এই তিনটা পেশা যদি ধ্বংস হয় তাহলে মানুষে কোথায় যাবে? ডাক্তারি একটি মহান পেশা। এই পেশাটি কতিপয় দুর্বৃত্তের কাছে বন্দী।”

এই কথা সত্যি যে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের বর্তমান সময়ে অনেক চিকিৎসকই রোগীকে চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু তার মধ্যেও অনেক চিকিৎসক জীবন বাজি রেখে বিশ্বব্যাপী রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। কোভিড ১৯ রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে ইতিমধ্যে অনেক চিকিৎসক নিজেরাও আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সাহসিকতা ও আন্তরিক সেবার জন্য আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, করোনায় আক্রান্ত না হয়েও যে সব সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা বিহীন মারা যাচ্ছে তাদের মৃত্যুর দায়ভার কে নেবে?
আর মনগড়া হাসপাতালের বিলের লাগাম টানা আধো কি জরুরি নয়?

এক্ষেত্রে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম স্যার যথার্থ বলেছিলেন, ‘মানসিক তৃপ্তিই চিকিৎসকের জীবনে সবচেয়ে বড় পুরস্কার’। তার উপলব্ধি, ‘সমানুভূতি না থাকলে চিকিৎসার পেশা হবে প্রাণহীনভাবে অর্থ উপার্জনের একটা পথ। সে ক্ষেত্রে এই মহান পেশার মানবিক দিকটা লাঞ্ছিত হবে, অপমানিত হবে, সাধারণ মানুষের চোখে তা প্রতিভাত হবে নিতান্তই কদর্যরূপে।’

এই অর্থোপার্জনের অবৈধ প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক, জেগে উঠুক মানবতা, মানুষের প্রতি মানুষের আমাদের দায়বদ্ধতা।।

লেখক : আইনজীবী ও ছাত্রনেতা।

Visits: 66

ট্যাগ :

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৫:১২
  • ১২:১৫
  • ১৬:২১
  • ১৮:০৩
  • ১৯:১৭
  • ৬:২৪