সাগরবাণীজীবনের শেষ চাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি ঘর - সাগরবাণী জীবনের শেষ চাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি ঘর - সাগরবাণী

জীবনের শেষ চাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি ঘর

প্রকাশ: ২০২১-০২-০১ ১২:২৩:১৩ || আপডেট: ২০২১-০২-০৩ ১৪:৪৮:৫৩

সড়কের পাশে খাস জমিতে ত্রিপল মোড়ানো এক কক্ষের বস্তি ঘরেই জীবন

মোঃ ওমর ফারুক
চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়লো লবণের মাঠ। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালককে ভাড়ার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে এগোতে লাগলাম মনোয়ারা-নবী দম্পত্তির সেই বস্তি ঘরে। সিএনজি অটোরিক্সার স্টেশন থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরবর্তী একটি স্লুইচ গেইটকে (পানি চলাচলের স্থান) স্পষ্ট দেখা যায়। স্লুইচ গেইটের পাশেই একটি সড়ক। সেই সড়কের সাথেই লাগোয়া বিবর্ণ একটি ত্রিপল মোড়ানো বস্তিঘর। স্টেশন থেকে প্রায় ৭ মিনিট হাঁটার দূরত্বে পৌঁছে গেলাম ওই বস্তি ঘরটিতে। কক্সবাজার সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের পূর্ব গোমাতলী গ্রামে এই দম্পত্তি বস্তি ঘরটির অবস্থান। প্রায় তিন দশককাল ধরে তারা এইভাবে জীবন পার করছেন।
বাড়িতে কি কেউ আছেন? অপরিচিত লোকের এমন কন্ঠস্বর শুনে বেরিয়ে এলেন মনোয়ারা বেগম নামে প্রায় ৬৫ বছর বয়সি এক নারী। এরপর ঠিক ১০ সেকেন্ডের ও কম সময়ে লাঠিতে ভর করে বেরিয়ে এলেন প্রায় ৮০ বছর বয়সি একজন পুরুষ। মিনিট পাঁচেক কথা বলার পর জানা গেলো তারা স্বামী-স্ত্রী। ত্রিপল মোড়ানো এই ভাঙ্গাচোরা এক কক্ষে বস্তি বাড়িতে তাদের বসবাস। দুইজনে হাত ধরাধরি করে একসাথে জীবন পার করছেন প্রায় চার যুগ।
মনোয়ারা-নবী হোসেন দম্পত্তির দুই সন্তান। বড় ছেলে সাহাব উদ্দিন। প্রায় ৪০ বছর বয়সি সাহাব উদ্দিন পেশায় একজন রিক্সাচালক। তিন কন্যা সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন পোকখালী ইউনিয়নের বাংলাবাজার ব্রীজ এলাকার রোহিঙ্গা পাড়া (বার্মাইয়া পাড়া) গ্রামে। তিনি একজন হাঁপানী রোগী। তার ছোট ছেলে জিয়াবুল হক কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ির পেঁচারদিয়ায় মারমেইড রিসোর্টে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিবার নিয়ে থাকেন পাশ্ববর্তী রেজুখাল সেতু এলাকার টিনশেড একটি ভাড়া বাসায়।
১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল ঘটে যাওয়া দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাতে জেলার সাগর কূলবর্তী ও উপকূলের অসংখ্য মানুষের ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকেই হারান চৌদ্দ পুরুষের রেখে যাওয়া সর্বশেষ ঠিকানা ভিটে-মাটি ও। সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভিটে-মাটি ও বসত গৃহ হারিয়ে পাশের গ্রাম বারআউলিয়া পাড়া থেকে ওই জায়গায় বসত গাড়েন মনোয়ারা-নবী হোসেন দম্পত্তি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সপ্তাহ খানেক পর নতুন ঠিকানায় আপন ভুবন তৈরি করে নেন ওই দম্পত্তি। ১৯৯৩ সালে বড় সন্তান সাহাব উদ্দিন তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তাদের ছেড়ে আলাদা হয়ে চলে যান অন্য ঠিকানায়। একই বছর ছোট সন্তান জিয়াবুল হক ও বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যান। গত ২৫ বছরের ও অধিক সময় তারা বাবা-মার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখেনি। এমনকি তাদের বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা কেমন আছেন ? কিভাবে জীবনযাপন করছেন ? খেতে পারছেন কি না? বেঁচে আছেন কি না তারও কোনো খোঁজখবর নেননি। এ দম্পত্তি এমনভাবে তাদের দুঃখভরা জীবনের কাহিনী বয়ান করছিলেন। কথাগুলো বলতে বলতে দুইচোখ ভরে অশ্রু গড়িয়ে যাচ্ছিলো মনোয়ারা বেগমের।


মনোয়ারা বললেন, ‘উপার্জন করার মতো সন্তান থাকলেও তারা আমাদের সাথে নেই। করোনাকালীন সময়ে সরকারের কাছ থেকে বয়স্ক ভাতা বাবদ প্রথমবার চার হাজার ও পরবর্তী পর্যায়ে দুই হাজার টাকাসহ মোট ছয় হাজার টাকা পেয়েছি। এছাড়াও অন্যান্য সময় প্রতিমাসে বয়স্ক ভাতা বাবদ মাসিক ৩ হাজার টাকা পাই। ফিতরা-যাকাতের টাকা ও মাঝেমধ্যে কেউ চোখ তুলে দিয়ে যায়। অন্য কেউ কোনো সহযোগিতা করলে তা দিয়ে কোনো সময় খেয়ে আবার কোনো সময় দুবেলা না খেয়ে জীবন চলছি। এভাবেই আমাদের সংসার পার হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। আমরা স্বামী-স্ত্রী যে জায়গাটিতে ত্রিপল মোড়ানো ঘরটি বানিয়েছি তা ও স্লুইচ গেইটের নিকটে সরকারি খাস জমি। পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ ও করুণ অবস্থা জেনে আমাদের সাথে দেখা করেছিলেন। সেসময় তিনি এই জায়গার দলিল খুঁজেছিলেন। কিন্তু খাস জমির দলিল কিভাবে দিবো। হয়তো দলিল দিতে পারিনি বলে পরবর্তীতে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। আমি তাকে বহুবার মুঠোফোন কল দিয়েছি। তিনি রিসিভ করেননি। গ্রামের অনেক মানুষ থেকে শুনেছি সরকার আমাদের মতো যারা প্রকৃত ভূমিহীন-আশ্রয়হীন পরিবার সেই সব অসহায় মানুষদের ঘরবাড়ি দিয়ে মাথা গোজার ঠাঁই করে দিচ্ছে। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সামান্য মাথা গোজার একটি ঘর চাই। আমি ও আমার স্বামীর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু শান্তিতে মরতে চাই।’
নবী হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জীবনের শেষ লগ্নে এসে ও যদি সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁই হতো আমাদের তাহলে জীবনের অনেকটা অতৃপ্তি-অপ্রাপ্তির লাঘব হতো। ত্রিপল মোড়ানো ঘরটি যদি বাতাসে উড়ে যায় তাহলে কীভাবে আরেকটি মাথা গোঁজার স্থান হবে তা আমার জানা নেই। আমরা দুইজন এই চিন্তায় সার্বক্ষনিক অস্থির থাকি। আমাদের সন্তানেরা খোঁজ নেয় না। আল্লাহর উপর ভরসা করেই কোনরকম বেঁচে আছি।’
যখন ফিলে আসছিলাম তখন ত্রিপল দিয়ে মোড়ানো সেই ছোট্ট ঘরটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন নবী হোসেন। তার চোখেমুখে পৃথিবীর সমস্ত অসহায়ত্বের ছাপ। দুশ্চিন্তার যেনো এই দম্পত্তির পেছনে লেগে থাকে সবসময়। সূর্য অস্ত যাচ্ছিলো পশ্চিমের দিগন্তে। একসময় সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নামে। প্রাকৃতিক নিয়মে এরপর রাত আসে। রাতের পর ভোরের আলোতে দিন আসে। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বিত মনোয়ারা-নবী হোসেন দম্পত্তির জীবনের চাকা ঠিকমতো চলে না। এখন তারা কেমন আছেন তা ও জানা নেই। হয়তো দিনে কোনো রকমে একবেলা খেয়ে জীবন পার করছেন। ভাবনায় শুধু কখন ডাক পড়বে ওপারের। ওপারের যাত্রী হওয়ার আগে কি জুটবে একটি ছোট্ট স্বপ্নের বসতঘর ?

Visits: 78

ট্যাগ :

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৮
  • ১১:৫৮
  • ১৬:৩২
  • ১৮:৩৫
  • ১৯:৫৭
  • ৫:১৮